চার বছর পর মিজোরাম থেকে নিজ পাড়ায় ফিরলেন তিন বম পরিবার
স্টাফ রিপোর্টার
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 13, 2026 ইং
অনুপম মারমা, প্রতিনিধি,থানচি,বান্দরবান।
‘নিজ দেশ ও মাতৃভূমি ছেড়ে সুখে নেই। নিজের পাড়া, নিজের মানুষ আর জন্মভূমির টান সবসময় মনে ছিল। চার বছর পর নিজ পাড়ায় ফিরে এভাবেই অনুভূতির কথা জানালেন ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেওয়া বম সম্প্রদায়ের তিন পরিবারের প্রধান।
দীর্ঘদিন পর বান্দরবানের থানচি উপজেলার নিজ পাড়ায় ফিরেছেন মিজোরাম থেকে আসা বম সম্প্রদায়ের তিন পরিবারের ১৮ সদস্য।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্পের সহায়তায় তাদের নিজ নিজ পাড়ায় গ্রামে প্রত্যাবর্তন করা হয়।
বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন সাফকাত মুবাররাত চৌধুরীর নেতৃত্বে সন্ধ্যা ৬টা তিন পরিবারের সদস্যদের শেরকর ও প্রাতা পাড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় শেরকর পাড়ার কারবারি তুমথন বম ও প্রাতা পাড়ার কারবারি পার্কেল বম উপস্থিত ছিলেন।
ফিরে আসা তিন পরিবারের প্রধান ভানরৌখম বম (২৭), রুয়াতখুপ বম (৪৬) ও লালচম বম (৫৫) জানান, কুকিচিন ন্যাশন্যাল আর্মির তাণ্ডবের কারণে তারা ২০২০ সালের দিকে নিরাপত্তার জন্য ভারতে মিজোরামে পালিয়ে যান। দীর্ঘ সময় সেখানে থাকার পর অবশেষে নিজ দেশ ও মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরে তারা স্বস্তি প্রকাশ করেন।
ভানরৌখম বম ২৭ বলেন, ‘নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে থাকলে কখনো নিজের বাড়ির মতো লাগে না। এতদিন পর নিজের পাড়ায় ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। নিজের মাটি ও মানুষের কাছে ফিরে এসেছি, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।
রুয়াতখুপ বম ৪৬ বলেন, ‘বাড়িঘর, আত্মীয়-স্বজন ও নিজের পাড়ার কথা সবসময় মনে পড়ত। মিজোরামে থাকলেও মন পড়ে থাকত দেশে। অনেক বছর পর আবার নিজের জায়গায় ফিরেছি।’
লালচম বম ৫৫ বলেন, ‘নিজ দেশ ও মাতৃভূমি ছেড়ে সুখে নেই। নানা কষ্টের মধ্যে এত বছর পার করেছি। এখন নিজের পাড়ায় ফিরে এসেছি। পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে চাই।
বম পরিবারের প্রধানরা বলেন, ২০২৩ সালে কুকিচিং ন্যাশনাল আর্মি সেনা ক্যাম্পে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েন এবং রাতভর বন্দুক যুদ্ধের পরে সেনা বাহিনীর চিরুনি অভিযানের থাকতে না পারে রুমা ও থানচি উপজেলার সীমান্ত ব্যবহার করে তারা ভারতের মিজোরামে গিয়েছিলেন। ২০২৬ সালে বম সোসাল কাউন্সিলের নেতৃবৃন্দ ও সেনাবাহিনীর উর্ধত্বম কর্মকর্তাদের সাথে মুঠোফোনে আমাদের নির্ভয় করেন। চলতি মাসের ১১ সেপ্টেম্বর মিজোরামের শিলকর থেকে রাঙ্গামাটির শিলকোপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। শিলকোপাড়া ১২ বিজিবির থেগামুখ বিওপি তাদের আটক করে হেফাজতে নেয়। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১১টা বান্দরবান রেজিয়নের আইসি বিভাগ (১৬ ইবি) তাদের গ্রহণ করে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানের নিজ পাড়ায় প্রত্যাবাসনের জন্য তাদের বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্পে পাঠানো হয়।
ফিরে আসা তিন পরিবারের মধ্যে থানচি সদর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডে শেরকর পাড়ার দুটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৭ ও ৮ জন এবং একই ওযার্ডে প্রাতা পাড়ার একটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৩ জন। তাদের মধ্যে শিশু ও কিশোরও রয়েছে।
নিজ পাড়ায় ফেরার আগে বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্পের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে নগদ ১৫ হাজার টাকা, ৫০ কেজি চাল, ১০ কেজি ডাল, ৫ কেজি তেল, ৫ কেজি পেঁয়াজ, ৫ কেজি আলু, ৫ কেজি লবণ, একটি সোলার প্যানেল, একটি ব্যাটারি, একটি বালতিসহ মগ, পাতিল, প্লেট ও গ্লাসসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হয়।
চার বছর পর ফিরে আসা পরিবারগুলোর সদস্যদের চোখেমুখে ছিল স্বস্তি ও আবেগ। দীর্ঘদিন পর জন্মভূমির মাটিতে পা রেখে তাদের প্রত্যাশা—অতীতের অনিশ্চয়তা পেছনে ফেলে এবার নিজ পাড়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে শান্তিতে বসবাস করা।
একদিকে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আপন মাটিতে ফেরার আনন্দ, অন্যদিকে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি—দুইয়ের মিশ্র অনুভূতি নিয়েই নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছেন তিন বম পরিবার।
আপনার মতামত লিখুন :